FeniNews

‘ফটোসেশন' বনাম ধান কাটার মৌসুম’



ফিরোজ আলম:

শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা পেতে

অলস গোঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;

মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তাঁর, - চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,

তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান ,

অথবা

চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,

তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল।

জীবনানন্দ দাশ ছাড়া আর কোন কবি কি? বাংলার ধানকে এমন রূপময় ব্যঞ্জনায় তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন ।

এখন বাংলা বৈশাখ মাস চলছে। ষড়ঋতুর চিরায়ত বাংলায় এখন ধান আর ফলফলাদি পাকার মৌসুম। এক সময় আমাদের দেশে বছরে দু’বার আমন,আউশ ধানের চাষ হতো। তখন নানা জাতের ইরি ধানের প্রচলন হয়নি। ১৯৭৬ সালে খালকাটা কর্মসূচির পর আমাদের দেশে ব্যাপক হারে ইরি ধানের চাষ শুরু হয়। যদিও বর্তমানে তিন ধরণের ধান চাষ হয়। আমন, আউশ ও বোরো। আমন (বোনা ও রোপা) ডিসেম্বর-জানুয়ারি, বোরো মার্চ-মে এবং আউশ জুলাই-আগস্ট মৌসুমে ফলানো হয়। অন্য ধানের তুলনায় বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র রোপা আমনের চাষ হয়। ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য। বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান চতুর্থ।

আউশ শব্দের অর্থ আগাম। আউশ ধানের মৌসুম হচ্ছে- বাংলা মাস বৈশাখ থেকে শ্রাবণ। বাংলাদেশে এবছর দেশে আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে ।

ধান চাষ ও কাটার প্রসঙ্গ: যখন আসলো তখন একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ হোক: আমি নিজেই কৃষক পরিবারের সন্তান । আই পাস করার আগ পর্যন্ত নিজেদের জমিতে হালচাষ করতে হয়েছে। ছোট বেলায় দাদার সাথে পরে পিতার সাথে ধান রোপা ও কাটার সময় শ্রমিকদেও দেখাশুনার জন্য মাঠে যেতে হয়েছে। ধান কাটা হলে নিজস্ব গরুর গাড়িতে সোনাপুর ,আলোকদিয়া চেওরিয়া বিল (স্থানীয় ভাষায় পাথড়) থেকে ধান বোঝাই করে নিয়ে আসা হতো। তখনও ধান মাড়ার এত ব্যবস্থা ছিল না, ফলে গরু দিয়ে মাড়াই করে অথবা বৌ ঝি’রা সে ধান পিটিয়ে , পা দিয়ে মাড়িয়ে পরে ধান ঝেড়ে খলায় শুকিয়ে সিদ্ধ করে গোলায় তুলতেন। আমার দাদা ছেলামত উল্ল্যা ছিলেন অনেক স্বাস্থ্যবান লম্বা একজন মানুষ । আমরা যখন ছোট তখন দেখতাম যে কোন তরকারি দিয়ে তিনি এক গামলা ভাত একাই খেয়ে ফেলতেন। পরিশ্রমী লোক ছিলেন। হালচাষ করার সময় চার কড়া বা ৬ ডিসিমেলের জমিতে তিন বার চাষ দেওয়ার পর মই দিয়ে জমি তৈরী করে বীজতলা থেকে জালা তুলে পর দিন পুরো জমি একাই রোপন করতেন। দাদার তখন পড়ন্ত বয়স তখনও তার সাথে আমরা এত কাজ পারতাম না।

পৃথবীতে ২০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাবার ভাত। শত শত জাতের চালের ভাত আছে বিশ্বে। বাংলাদেশে তিন ধরণের চাল পাওয়া যায় ১.ঢেঁকি ছাঁটা, ঢেঁকি ব্যবহার করে ধান ভেঙ্গে এই চাল তৈরি করা হয। এধরণের চাল কিছুটা লালচে ধরণের হয়। এ চালে পুষ্টিমান বেশী ।

২.সিদ্ধ চাল ধান ভেঙ্গে চাল বের করার পুর্বে তা সিদ্ধ করা হয়।৩,আতপ/আলো চাল, ধান রোদে শুকিয়ে এই চাল তৈরী করা হয়। ধানের জাত ও চালের গড়ন অনুসারে ইরি, বোরো,আমন ,নাজির সাইল পাইজাম,লতা সাইল ,নাজির সাইল প্রভৃতি। সুগন্ধি চালের মধ্যে , বাসমতী কালিজিরা ,গোবিন্দভোগ, কাটারিভোগও চিনি গুড়া অন্যতম।

তবে মোট জনসংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশিরা পিছিয়ে থাকলেও মাথাপিছু ভাত খাওয়ার হিসাবে কিš‘ চীনাদের চেয়ে বাংলাদেশিরাই এগিয়ে রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি গড়ে বছরে ২১৭ কেজি চালের ভাত খায়। ইন্দোনেশিয়ার মানুষের বেলায় এ পরিমাণ ১৫১ কেজি চাল। আর চীনারা খায় ১০৪ কেজি চালের ভাত। ভারতীয়রা সবচে কম, মাত্র ৭৬ কেজি চালের ভাত খায়!

এ লেখার হেডিং ছিল সেলফি বনাম ধান কাটার মৌসুম। এ বছর ধানের অভাবনীয় ফলন হয়েছে। কিন্তু করোনা ভাইরাস জনিত কারণে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুযোগ থাকলে দলীয় নেতা কর্মীদের কৃষকের ধান কেটে দেওয়ার জন্য বলেছেন। এরপর অনেককে কৃষকের ক্ষেতে গিয়ে ধান কাটতে দেখা যায়।

‘করোনাভাইরাস: ধান কাটায় কৃষককে সাহায্য করার নামে 'ফটোসেশন' কী বলছেন সংশ্লিষ্টরার ?’ শিরোনামে ৩০ এপ্রিল বিবিসি বাংলা’য় ‘নাগিব বাহারের’ একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । এ রিপোর্টে বলা হয়-

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্প্রতি বহু ছবি ভাইরাল হচ্দেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে সরকারদলীয় নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা দলবল নিয়ে ধান কাটছেন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে জারি করা লকডাউনের কারণে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, তাই কৃষকদের এভাবে সাহায্য করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। কিন্তু‘ এসব ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হচ্ছে বিস্তর সমালোচনা।

কেউ কেউ লিখছেন, এমপি মন্ত্রীরা দলবল নিয়ে মূলতঃ ধান কাটার নামে 'ফটোসেশন' করছেন। আর এটা করতে গিয়ে ধান কাটার কাজটাই ঠিকমতো করছেন না তারা, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে কৃষকদের ক্ষতি করছেন তারা। কৃষকদের অনেকেই অভিযোগ করেন যে ধান কাটার ছবি তোলা বা ভিডিও করা শেষ হওয়ার পরই সাহায্য করতে আসা ব্যক্তিরা চলে যান। বুধবার সকালে সুনামগঞ্জে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে হওয়া ধান কাটার সে রকম এক অনুষ্ঠান নিয়ে নানা সমালোচনা করছেন বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান-সহ মোট ৬ জন সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের অনেকে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওই ধানকাটা অনুষ্ঠানের ছবি তুলছেন বহু মানুষ, এটা করতে গিয়ে তারা ক্ষেতের পাকা ধান একেবারে মাড়িয়ে ফেলছেন।

রোদ বৃষ্টিতে ভিজে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাদের ফসল উৎপাদন করে। সে ফসলের কোন ক্ষতি হলে তারা মনে দু:খ পায়। কৃষকের ধান কেটে তাঁদের ফসল ঘরে তুলে দেওয়া ভালো উদ্যোগ। কিন্তু‘ ধানক্ষেতে গিয়ে ধান নষ্ট করে সেলফি তুলে লোক দেখানো সে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ একটি হীন কাজ। তাই অনতিবিলম্বে এটি বন্ধ করা উচিৎ বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।


লেখকঃ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক




প্রকাশঃ শনিবার, ০২ মে ২০২০, ১০:২৪ অপরাহ্ন


ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় দুই দল ডাকাতের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে এক ব্যক্তি নিহত... বিস্তারিত

ঈদের আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিতে পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে "ঈদের সাজে ছোট্ট সোনামণির... বিস্তারিত

ঈদের আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিতে পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে "ঈদের সাজে ছোট্ট সোনামণির... বিস্তারিত

পবিত্র ঈদুল আযহা ২০২০ইং উপলক্ষে ছাগলনাইয়া উপজেলার অস্বচ্ছল ও অসহায় মানুষদের মাঝে... বিস্তারিত

“।শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুদা হবে নিরুদ্দেশ” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পবিত্র... বিস্তারিত

আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও ফেনী ইউনিভার্সিটি... বিস্তারিত

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ছাগলনাইয়া... বিস্তারিত

‘সবুজে বাঁচি,সবুজে বাঁচাই,নগর প্রাণ প্রকৃতি সাজায়’এই স্লোগানে শুভপুর সমাজ কল্যাণ... বিস্তারিত

জাতীয় সংসদের ২৬৫ ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার এর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদান... বিস্তারিত